চট্টগ্রামে ৫ বছরে বন্ধ ১৮৩ পোশাক কারখানা

চট্টগ্রাম নগরীর মনসুরাবাদ এলাকায় রফতানিমুখী একটি পোশাক কারখানা করেছিলেন ব্যবসায়ী এসএম জাহিদ চৌধুরী। নাম সাদাফ ফ্যাশন। অনেক কষ্টের পর প্রতিষ্ঠানটি দাঁড়িয়েও যায়। দেখতে থাকে লাভের মুখ। শ্রমিক সংখ্যা বেড়ে ৮শ’তে দাঁড়ায়। কিন্তু হঠাৎ যেন বাজ পড়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও শ্রমিকদের মাথায়। ২০১৫ সালে বিদেশি ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড প্রতিনিধি দল পরিদর্শন শেষে কারখানার ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে। এটি বন্ধের সুপারিশ করা হয়। অ্যাকর্ডের রিপোর্টের পর মুখ ফিরিয়ে নেন বিদেশি ক্রেতারা। ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কথা চিন্তা করে শ্রমিকরাও চলে যান অন্য প্রতিষ্ঠানে। এভাবেই বন্ধ হয়ে যায় সাদাফ ফ্যাশন। আর সব হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যান জাহিদ চৌধুরী।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার কারখানা বন্ধের পর গত প্রায় আড়াই বছরে দেশে ভূমিকম্প হয়েছে ২১টি। এর মধ্যে কয়েকটি বড় মাত্রার কম্পনও ছিল। কিন্তু ভূমিকম্পে সাদাফ ফ্যাশনের ভাড়া করা সেই ভবনটি ধসেনি। এখনও ভবনটি অন্যরা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করছেন। ভবনটি টিকে থাকলেও অ্যাকর্ডের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তে ধসে গেলাম আমি। কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ১৫ কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে আমাকে। বলতে গেলে আমি এখন জীবন্ত লাশ।’

একই বছর বন্ধ হয় মনটেক্স অ্যাপারেল লি. ও মাস ফ্যাশন। এর কর্ণধার মোরশেদুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘অ্যালায়েন্সের রিপোর্টের পর তারা দুটি কারখানা বন্ধ করতে হয়েছে। এতে তার লোকসান হয়েছে কয়েক কোটি টাকা।’

এভাবেই পোশাক ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের তৎপরতাসহ নানা সংকটে তৈরি পোশাক শিল্পের ‘আঁতুড় ঘর’ চট্টগ্রামে বন্ধ হচ্ছে একের পর এক কারখানা। গত ৫ বছরে বন্ধ হয়ে গেছে এখানকার ১৮৩টি তৈরি পোশাক কারখানা। আরও কিছু কারখানা বন্ধের পথে।

পোশাক রফতানিকারকরা বলছেন, শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি, রফতানি অর্ডার কমে যাওয়া, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়াসহ নানামুখী সংকটে ছোট ও মাঝারি আকারের কারখানাগুলো অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারছে না। এ কারণে লোকসান মাথায় নিয়ে এগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা। এ অবস্থাকে তারা চট্টগ্রামের গার্মেন্ট শিল্পের চরম দুঃসময় বলেও অভিহিত করছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে তৈরি পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল চট্টগ্রাম থেকে। নগরীর কালুরঘাট এলাকায় ১৯৭৮ সালে স্থাপিত দেশ গার্মেন্টস প্রথম বিদেশে পোশাক রফতানি শুরু করে। এরপর আশি ও নব্বইয়ের দশকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে দ্রত প্রসার লাভ করে তৈরি পোশাক শিল্প। শুরু থেকে এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৬৭৬টি কারখানা স্থাপিত হয়। এর মধ্যে নানা কারণে বন্ধ হয়ে গেছে ৩১৭টি। বর্তমানে চালু রয়েছে ৩৫৯টি। চালু কারখানাগুলোর মধ্যে সরাসরি রফতানিতে সংশ্লিষ্ট আছে ২১১টি। বাকিগুলো সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করছে।

বিজিএমইএ সূত্র জানায়, গত ৫ বছরে চট্টগ্রামে মোট ১৮৩টি গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ৭৯টি বন্ধ হয়েছে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স এবং আইএলওর শর্ত পূরণ করতে না পারায়। বাকিগুলো বন্ধ হয়েছে রফতানি আদেশ কমে যাওয়া ও অন্যান্য সমস্যার কারণে। এর মধ্যে ২০১৩ সালে ২২ টি, ২০১৪ সালে ৪৫টি, ২০১৫ সালে ৩২টি, ২০১৬ সালে ৫১টি ও চলতি বছর এ পর্যন্ত ৩৩টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি মাঈনুদ্দিন আহমেদ মিন্টু রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের তৈরি পোশাক শিল্প চরম দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রায় অর্ধেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরও কিছু কারখানা বন্ধের পথে। বন্ধ কারখানার মালিকরা ব্যাংক লোন ও ধারদেনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর সুযোগ পেয়ে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স নানা অজুহাতে দেশের গার্মেন্ট সেক্টরের যে ক্ষতি করেছে তার ধাক্কা চট্টগ্রামেও লেগেছে। তাদের নানা শর্তের জালে শিল্পটি প্রায় ধ্বংসের পথে। সুকৌশলে দেশি-বিদেশি একটি চক্র গার্মেন্ট শিল্পকে শেষ করে দিতে চাইছে। গার্মেন্ট শিল্প রক্ষায় সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। ষড়যন্ত্রকারী চক্রকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘একদিকে রফতানি আদেশ কমছে, অন্যদিকে শ্রমিক মজুরি ও গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণেও বিপাকে রয়েছেন গার্মেন্ট মালিকরা।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *