‘জারা ফ্যাশন হাউজ’ জিরো থেকে জারা

আমানসিত্ত অর্তেগা বিশ্বের ধনীদের তালিকায় তৃতীয়। ধনী হয়েও নিজের সেরা হওয়ার গল্প বলতে পছন্দ করেন অনেকেই। কিন্তু অর্তেগা কখনও নিজের প্রশংসায় মত্ত হননি। নিশ্চুপ থেকে নিজের ব্যবসাকে ছড়িয়েছেন বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে। ৪০ বছর ধরে ফ্যাশন ব্যবসাকে জনপ্রিয় করেছেন বিশ্বব্যাপী।

কি এমন ব্যবসা করেন অর্তেগা -এমন প্রশ্ন মনে আসাটাই স্বাভাবিক। ৭৬ বছরের উদ্যোগী এ মানুষটি ইন্ডিটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। ফ্যাশন জগতের রাজা হিসেবে তিনি বিখ্যাত।

কিন্তু কজনই বা জানে এমন উদ্যোক্তার নাম? বিস্ময়ের কথা হচ্ছে, ১৯৯৯ সালের আগ পর্যন্ত বিশ্বের কোনো মিডিয়াতেই অর্তেগার কথা সোচ্চার হয়ে উঠে আসেনি। কেউ তার কাছে ইন্টারভিউ নিতেও যায়নি। কিন্তু অসংখ্য ঘটনার আড়ালে বসে নিভৃতে বনে গেছেন বিশ্বের সেরা ধনীদের একজন। ‘জারা ফ্যাশন হাউজ’ হচ্ছে ইন্ডিটেক্স গ্রুপের অন্যতম ব্র্যান্ড।

বলা হয়, ইউরোপ ফ্যাশনকে অর্তেগা একাই নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। ৪০ বছর আগে যখন ব্যবসা শুরু করেন তখন অনেক ভেবেচিন্তেই মাঠে নামেন তিনি। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, এ ব্যবসার ভাবনার শুরুতেই খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করি।

কারণ বাজার ধরতে তাদের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। আসল কাজ তারাই করবে। আমি নিজেও একজন খুচরা বিক্রেতা। বিশ্বব্যাপী ফ্যাশন হাউজে আমি নিজেউ পণ্য সরবরাহ করি।

ফ্যাশন ব্যবসায় নিজেকে সেরা করার পেছনে দুটি কারণের কথা উল্লেখ করে অর্তেগা বলেন, ক্রেতাদের আমি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। তারা কি চায় তা বিবেচনা করেই পণ্য প্রস্তুতে মনোযোগ দেই। আর বাজারে তা দ্রুততম সময়ে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করি।

শুধু এ দুটি অঙ্গীকার সর্বোচ্চ বিবেচনায় নিয়েই ফ্যাশন ব্যবসা করলে যেকোনো উদ্যোক্তাই সফল হতে পারবেন। কারণ বিশ্বব্যাপী ফ্যাশন এবং তথ্যপ্রযুক্তি খুব দ্রুত গতিতে বদয়ে যাচ্ছে। বদলের জন্য অন্য কি করছে তা বিবেচনায় না নিয়ে নিজেকেই উদ্যোগী হতে হবে। যখন আমি নিজেই বদলে দেওয়ার উদ্যোগ নেব। তখন বাজারে আমিই সেরা হবো। এটাই স্বাভাবিক।

ইন্ডিটেক্স ফ্যাশন হাউজ ভালো ব্যবসা করলেও শুরু থেকেই তারা কখনও প্রচারে বিশ্বাসী ছিল না। তাই প্রতিযোগিতার কথা মাথাতেই রাখেনি। অর্তেগার মতে, অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে লাভ নেই। কিংবা প্রচারণা করেও তেমন সুফল আসে না। যারা পণ্য ক্রয় করবেন তারাই যেন প্রচারের ব্যবস্থা করেন, এমন পণ্যই বাজারে নিয়ে আসা উচিত।

বিশ্বব্যাপী মন্দা যখন শুরু হয় তখন স্পেনের অনেক তরুণ বেকার হয়ে পড়ে। ব্যবসায় ধ্বস নামে। অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান উৎপাদনহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু এসব কিছুর পরও স্পেনের ইন্ডিটেক্স আছে অনড়। এ সম্পর্কে স্প্যানিশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফ্যাশন ডিজাইনারের সভাপতি বলেন, স্পেনের ভেতর ইন্ডিটেক্স যেন অন্য জগৎ। মন্দার কোনো প্রভাবই তাদের ওপর পড়েনি।

গত বছরের হিসাব দিতে গিয়ে ইন্ডিটেক্সের প্রধান নির্বাহী পাবলো ইসলা বলেন, প্রতি ত্রৈমাসিকে রেভিনিউ বেড়েছে ১৭ ভাগ। এমনকি জরিপে দেখা গেছে, প্রতিদিন গড়ে একটি করে ‘জারা স্টোর’ খোলা হচ্ছে বিশ্বের কোথাও না কোথাও।

প্রসঙ্গত, লন্ডনের মতো শহরে ৬ হাজার জারা স্টোর আছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে ৪৬টি, চিনে ৪৬৭টি এবং স্পেনে ২ হাজার জারা স্টোর আছে। পুরো ব্যবসার শতকরা ৫৯ ভাগ অর্তেগার নিয়ন্ত্রণে।

অর্তেগার জন্ম ১৯৩৬ সালে নর্থ স্পেনে। বাবা রেলওয়ে বিভাগে শ্রমিক ছিলেন। মা বিভিন্ন বাসায় কাজ করে অর্থ উপার্জন করতেন। এমনই দরিদ্র পরিবারে বেড়ে উঠেছেন অর্তেগা।

কিন্তু পড়াশোনায় ছোটবেলা থেকেই আগ্রহী ছিলেন তিনি। মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকেই অর্থের অভাবে বিভিন্ন ধরনের শ্রমিকের কাজ করতে হয়। কিন্তু কখনও কোনো কাজকে ছোট করে দেখেননি। তিনি ‘গালা’ নামে এক দোকানে চাকরি নেন। সেখানে শার্ট, মৎসজীবীদের ক্যাপ ছাড়াও বিভিন্ন জিনিস পাওয়া যায়। এখানেই কাজ করতেন অর্তেগা।

এ সম্পর্কে স্থানীয় এক সংবাদিক তার প্রতিবেদনে একবার উল্লেখ করেন, অর্তেগা গালা শপের কর্মী ছিলেন। গালা আগে যে পণ্য বিক্রি করতো এখনও তাই করছে। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার অর্তেগা আজ কোথায় চলে গেছে! গালা পড়ে আছে সেই আগের জায়গাতেই।

এ ছাড়াও গালা শপের মালিকের ছেলে জো মার্টিনি একবার বলেন, বাবার ব্যবসা আমি চালিয়ে নিচ্ছি। ঐতিহ্য রক্ষায় ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি। এখন তেমন ক্রেতা এখানে আসে না। বলতে গেলে অলস সময়ই পার করতে হয়।

কিন্তু যেদিন অর্তেগা এখানে বেড়াতে এসেছিল সেদিন হাজারো ভক্তের ভিড় জমে। আমার ছোটবেলার বন্ধু অর্তেগাকে দেখার জন্য মানুষের এমন ভিড়। কেউ কিছুই কিনতে আসেনি। সবাই আমার বন্ধুকেই দেখতে এসেছে।

এবার অর্তেগার ব্যবসা শুরু করার প্রসঙ্গে আসি। মাত্র ১৬ বছর বয়সেই তিনি বুঝে গেছেন পণ্যনির্ভর ব্যবসা করতে হলে ক্রেতাদের মনকে বুঝতে হবে। এ বিষয়টি গালা শপের মালিককে বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাচ্চা ছেলের কথায় তেমন পাত্তা দেয়নি কেউই।

অর্তেগা তখন নিজেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। খেয়াল করলেন হাজারো শ্রমিক দিনরাত পরিশ্রম করেন। কিন্তু বাসায় তাদের স্ত্রীরা অলস সময় পার করে। ঠিক তখনই তার মাথায় বুদ্ধি এল। তিনি কাপড়ের ব্যবসা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। অর্তেগা তখন সব নারীদের কাজ করতে উৎসাহী করতে থাকেন। আগ্রহীদের প্রয়োজনে কাজও শেখানোর ব্যবস্থা করা হবে বলে তিনি জানান।

সে সময় ১৪ বছর বয়সের তরুণী লপেজ (বর্তমান ৫২ বছর) বলেন, আমরা সবাই অর্তেগাকে চিনতাম। খুব ভালো ছেলে। দিনভর উৎসাহ দিত। কাজ করতে বলতো। আমরাও রাজি হই। সব সময় বলতো, ঘরে বসে না থেকে কাজ করে যদি অল্প কিছু অর্থ আসে তাতেই বা মন্দ কি!

মা ও আমি এ কথা শুনেই রাজি হয়েছিলাম। কাজ করতাম। আমাদের সঙ্গে মিশে অর্তেগাও কাজ করতো, শেখাতো। শুরুতে কাপড় বানিয়ে বিভিন্ন শপগুলোতে বিপণন করা হতো। আর এ পুরো প্রক্রিয়া অর্তেগা নিজেই করতেন।

অর্তেগা ১৯৭৫ সালে প্রথম স্টোর দেন। নিজের পছন্দের নামে সঙ্গে মিলিয়েই নাম দেন ‘জারা’। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। শুরুর ১০ বছর না যেতেই পর্তুগালে প্রথম আন্তর্জাতিক স্টোর খুলে বসেন। ইউরোপ ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে ওঠে অর্তেগার ‘জারা’। এজন্যই তাকে বলা হয় ‘কিং অব জারা অ্যাম্পায়ার’।

এখনও অর্তেগা তার দুই নীতিতে বিশ্বাসী। তার প্রতিষ্ঠানের সবাই বিশ্বাস করে প্রচারণা আসবে পণ্যের ভোক্তাদের কাছ থেকেই। ‘জারা ওমেনস ট্রেন্ডের’ প্রধান এ সম্পর্কে বলেন, আমরা কখনও কোনো প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করিনি।

জারা সব সময় ক্রেতাদের চাহিদা নিয়ে কাজ করে। আমরা ব্লগ ট্র্যাক করার চেষ্টা করি। ব্লগাররা পণ্য নিয়ে কি বলেন তা নিয়মিত খেয়ার করি। আর এর ভিত্তিতেই প্রতিনিয়ত সিদ্ধান্ত বদলাতে থাকে। আমাদের স্টাইলে জারা পরিচালিত হয় না। জারা চলে ক্রেতাদের ভাবনার সঙ্গে।

অর্তেগা নতুনত্ব পছন্দ করেন। এ জন্য ২০১১ সালের জুলাই মাসে প্রধান নির্বাহীর পদ ছেড়ে পাবলো ইসলাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। যাদের নিয়ে ইন্ডিটেক্স শুরু হয় তাদের প্রত্যেকেই এখনও আছেন। এমনও কর্মী আছেন যাদের বয়স তখন ছিল ১৩ থেকে ১৬ বছর। তারা বয়সে এখন প্রত্যেকেই প্রবীন।

তারা এ সম্পর্কে বলেন, এ প্রতিষ্ঠানের অনেকেই যৌবনে এসেছে। আমরা বেড়ে উঠেছি অর্তেগার সঙ্গে। আমরা সবাই বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু জারা এখনও তরুণ। তার একমাত্র কারণ অর্তেগা।

সে কখনও কারও মতামত অবহেলার বিবেচনায় নেননি। আমরা সবাই মিলে এ প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। কখনও মনে হয়নি এটা অর্তেগার সম্পদ। মনে হয়েছে এ প্রতিষ্ঠান আমাদের। অর্তেগাও কখনও বলেনি এটি তার। সব সময় বলেছে ইন্ডিটেক্স আমাদের সবার অর্জন।

অর্তেগার কক্ষে যেতেও কখনও অনুমতি লাগেনি। যখন ইচ্ছা ঢুকে যেতে পারতাম। কখনও উচ্চস্বরে বকাও দেয়নি। বরাবরই বলেছে, যখনই কাজ করতে খারাপ লাগবে একটু সময় নাও। তারপর আবার ফিরে আসো।

আমানসিত্ত অর্তেগা এমনই উদার। ছোট্ট শহর থেকে উঠে আসা ফ্যাশন জগতের এ মানুষ যেন ‘জিরো থেকে হিরো’ হওয়া রুপকথার গল্পের নায়কের মত। তারপরও শান্ত মেজাজের আড়ালে থাকতে পছন্দ করা অর্তেগা আবেগী কণ্ঠে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এতো সম্পদ আর সফলতা ভালো লাগে না।

প্রতিদিন দরজা বন্ধ করে কাঁদি। বাবা-মাকে অমানবিক কষ্ট করতে দেখেছি। তাদের এক মুহূর্ত শান্তি দিতে পারিনি। চিন্তা করেন, তাদের সন্তান এখন নাকি বিশ্বের সেরা ধনীদের একজন।

কত গর্বিত পিতা-মাতা তারা। অথচ সে কথা জানার সুযোগই পেল না। এক ছোট্ট শহরে শূন্য থেকে শুরু করেও বিশ্বের দরবারে পরিচিত হওয়া যায়। এ বিস্ময়কর ঘটনা যে গল্প নয়। এটা বাবা-মা জেনে গেলে কি এমন ক্ষতি হতো!

বিশ্বের সেরা ধনীদের একজন হয়েও মনের ভেতর এমন কষ্ট নিয়ে ঘুরে বেড়ান অর্তেগা। ফ্যাশন জগতের এ মানুষটি বিশ্বকে বিস্ময় উপহার দিয়েছেন। আড়লে থেকে জয় করেছেন দারিদ্র্যকে। এ জন্যই বলতে হয়, অর্তেগা ‘জিরো থেকে জারা’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll Up