দেশের ফ্যাশন ইতিহাস নিয়ে বই লিখছেন আফসানা

পেন্সিল-স্কেল নিয়ে ঘরবাড়ির নকশা করবেন, এমন ভাবনাটা ছোটবেলার। সেখানে জায়গা ছিল না ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের কিংবা আফসানা জানতেনই না এ পেশায়ও চাকরি করা যায়। তাই স্থপতি হওয়ার স্বপ্ন নিয়েই উচ্চ মাধ্যমিকের পড়াশুনা শেষ করা। ২০০৮ সালের কথা। একজন বন্ধুকে ভর্তি পরীক্ষায় সহযোগিতা করতে বিজিএমইএ ইনস্টিটিউট অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজিতে যাওয়া। অনেকটা হেয়ালির ছলেই এখানে ভর্তি পরীক্ষার জন্য ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন। একদিন প্রতিষ্ঠানটি থেকে তাকে ফোন করে বলা হয়, ‘আজ তো ভর্তির শেষ দিন, আপনার রেজাল্টও ভালো, ভর্তি হবেন?’ সে সময় আফসানারও কোথাও ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন ছিল, তাই সুযোগটা কাজে লাগালেন।

কিন্তু বিপত্তি বাধে ‘বিভাগ’ বাছাই নিয়ে। বিজিএমইএতে ফ্যাশন ডিজাইনিং অ্যান্ড টেকনোলজি, অ্যাপারেল মার্চেন্ডাইজিং ও নিটওয়্যার— কোনটিতে ভর্তি হবেন! শেষমেশ ঠিক হয় ফ্যাশন ডিজাইনিং অ্যান্ড টেকনোলজি। তার বিষয় ফ্যাশন হলেও প্রথম সেমিস্টারে পড়তে হয়েছে পদার্থ, জীববিদ্যা আর রসায়নের বইগুলো। একদিন এ ধরনের কাঠখোট্টা বিষয়ের বাইরে ফ্যাশন-বিষয়ক বিভিন্ন বইপত্রের খোঁজ পেলেন বিজিএমইএর লাইব্রেরিতে। ক্লাসের বাইরে সেখানেই সারা দিন কাটত। সে সময় যদি কেউ তার খোঁজ করত, তাহলে বন্ধুরা এক কথায় বলে দিত, ‘লাইব্রেরিতে গেলে ওকে পাওয়া যাবে।’  আফসানার ভাষ্য, ফ্যাশনের বইগুলো পড়তে পড়তে এ বিষয়গুলো ঘিরে এক ধরনের ভালোবাসা তৈরি হয়ে যায় তার। এভাবেই কেটে যায় প্রথম বছর।

প্রতি বছর ইউরোপিয়ান দূতাবাস থেকে আয়োজন করা হয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফ্যাশন শো। আফসানা তখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। তার চোখে পড়ে প্রতিযোগিতা ঘিরে সিনিয়র শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের আগ্রহ। এতে উত্সাহিত হলেন তিনি। কিন্তু সে  প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার নিয়ম হলো, প্রতিযোগীকে পোশাক তৈরি করে দিতে হবে। সমস্যা একটা ছিল, ক্লাসে তখনো পোশাক তৈরি করাটা তাদের শেখানো হয়নি। তবে দমে যাওয়ার মেয়ে নন বলে ইউটিউব ঘেঁটে পোশাক বানানোর খুঁটিনাটি সম্পর্কে জানতে বসে যান। এর পর নিজেই নকশা আর প্যাটার্ন বানিয়ে একজন দর্জির সাহায্যে কাপড় তৈরি করে প্রতিযোগিতায় জমা দেন।

প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষণার দিনে মঞ্চ থেকে তৃতীয়, দ্বিতীয় বিজয়ীর নাম ধরে যখন ডাকা হচ্ছিল, আফসানা তখন ভুলেও ভাবেননি প্রথম বিজয়ী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করা হবে। অভিজ্ঞ শিক্ষার্থীদের ভিড়ে সাত বছর আগে এভাবেই নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখেছিলেন তরুণ ডিজাইনার আফসানা ফেরদৌসী। সেদিনের কথা মনে করে তিনি বলেন, ‘এই প্রথম আমি ফ্যাশনের ব্যাপ্তিকে উপলব্ধি করতে পারি। সেদিন নতুন করে আমি পরিণত হই। জেনে যাই আমার আগামীকে।’

আফসানার অংশ নেয়া পরের প্রতিযোগিতার পরিসর ছিল আরো বিস্তৃত। পরের বছর (২০১১ সালে) বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের নিয়ে সোসাইটি অব ডাইয়ার্স অ্যান্ড কালারিস্টের (এসডিসি) স্টুডেন্ট ডিজাইন কম্পিটিশন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ থেকে নির্বাচিত হন। এ পর্যন্ত ঢাকার বাইরে যে মেয়েটি কখনই একা পা রাখেনি, এ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তাকে যেতে হয় হংকংয়ে। ১৬টি দেশ থেকে নির্বাচিত প্রতিযোগীদের পোশাক নিয়ে হয় এ আয়োজন। সেখানে জুরি বোর্ডের মুখোমুখি হয়ে নিজেদের পোশাক সম্পর্কে কথা বলতে হয় অংশগ্রহণকারী ডিজাইনারদের। এ প্রতিযোগিতায় আফসানা তার নকশা করা পোশাক দিয়ে জিতে নেন প্রথম রানারআপের খেতাব। প্রতিযোগিতার প্রতিপাদ্য ছিল, ‘রিডিউস, রিইউজ, রিসাইকেল।’ যেহেতু এটি ছিল একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, তাই আফসানা গুরুত্ব দিয়েছিলেন পোশাকের মাধ্যমে দেশকে উপস্থাপনের বিষয়টি। তাই ঠিক করেন পুরনো ফেলে দেয়া জিনিস সংগ্রহ করে তা পুনর্ব্যবহার করবেন। এজন্য পিঁয়াজের খোসা থেকে শুরু করে সংগ্রহ করেছেন গাদা ফুল, পরবর্তীতে তা ডাই করে তৈরি করলেন রঙ। তাছাড়া ডিজাইন মোটিফ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন রিকশা মোটিফকে। রিকশার সিট, চাকা, হুডসহ বিভিন্ন অংশকে ডিজাইন হিসেবে ব্যবহার করেন পোশাকে। দেখা যায়, একটা নতুন পোশাক তৈরি করতে গেলে সবসময়ই বাড়তি কিছু কাপড় ফেলনা যায়, আফসানা ঠিক করে রেখেছিলেন এমনটা করবেন না। তিনি পুরনো কাপড়গুলোকেই নতুন ডিজাইন করেছিলেন।

দেশে ফিরে বিভিন্ন পত্রিকার পাতায় তাকে নিয়ে খবরের শিরোনাম হয়। বিবিসির এক প্রতিবেদক আফসানা ফেরদৌসীর ওপর একটি তথ্যচিত্রও তৈরি করেন। পরের গল্পগুলো শুধুই অর্জনের। বাটেক্সপো ফ্যাশন শোতে অংশ নেয়ার পাশাপাশি বিজিএমইএ ইউনিভার্সিতে থেকে প্রেসিডেন্সি অ্যাওয়ার্ড পান কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ। ২০১৪ সালে লন্ডনের আল কেমি ফ্যাশন ফেস্টিভ্যালে নিজের নকশা করা পোশাক নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। পরের বছর অংশ নেন বার্লিনের একটি প্রদর্শনীতে। বর্তমানে তিনি ফ্যাশন ডিজাইন কাউন্সিল অব বাংলাদেশের সদস্য। ২০১৬ সালে লন্ডন ফ্যাশন উইকে বাংলাদেশ থেকে ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল ও রিনা লতিফের সঙ্গে আমন্ত্রণ জানানো হয় তাকেও। একই বছর অংশ নেন ইন্টারন্যাশনাল ওয়েভার্স ফেস্টিভ্যালে। এসডিসির ইন্টারন্যাশনাল ডিজাইন কম্পিটিশনে বাংলাদেশের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি বর্তমানে লেখালেখিতে মগ্ন আছেন। বই লিখছেন বাংলাদেশের ফ্যাশন ইতিহাস নিয়ে।

সাক্ষাত্কারের এক ফাঁকে আফসানা বলেন, ‘কোনো অনুষ্ঠানে কিংবা ফ্যাশন শোতে আমাকে দেখে যখন কেউ বলেন, ডাক্তার, আর্কিটেক্ট নয়, আমার মেয়েকে তোমার মতো ফ্যাশন ডিজাইনার বানাতে চাই। এটা শুনে আমার ভীষণ গর্ব হয়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *