জামদানির মনকাড়া সমারোহ

 
জাদুঘরে ঈদ উপলক্ষে বিসিক আয়োজিত জামদানি প্রদর্শনীতে পছন্দের শাড়ি বাছাই করেন ক্রেতারা l ছবি: প্রথম আলোভালো সুতা, দক্ষ কারিগর, ঐতিহ্যবাহী নকশা—এই তিনের সমন্বয় হলেও ভালো জামদানি শাড়ি হবে না। আদি ও আসল জামদানির জন্য আরও চাই শীতলক্ষ্যা নদীর হাওয়া, নদীপারের মাটির আর্দ্রতাও। পরিবেশ-প্রকৃতিরও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে রঙে, নকশায়, বুননে অনন্য হয়ে ওঠা জামদানির নেপথ্যে। সে কারণে একমাত্র নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জেই বহুকাল থেকে বংশানুক্রমিক ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে অতুলনীয় এই বস্ত্রশিল্প। বয়নশিল্পের বিস্ময় মসলিনও হতো এই এলাকাতেই। সেটি বিলুপ্ত। নানা ঘাত-প্রতিঘাত সয়েও জামদানি টিকে আছে। আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে স্বনামখ্যাত এই শাড়ির প্রদর্শনী চলছে এখন জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনকক্ষে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছে ২০টি জামদানি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। ১৭ জুলাই থেকে প্রদর্শনী শুরু হয়েছে, চলবে ২৩ জুলাই পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত খোলা। প্রদর্শনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত বিসিকের শিল্পনগর কর্মকর্তা কামাল উদ্দিন জানালেন, বিসিকের আয়োজনে আগেও তাঁদের মতিঝিলের কার্যালয়ে ছোট আকারে জামদানি প্রদর্শনী হয়েছে এবং তাঁরা বিভিন্ন মেলায় জামদানির স্টল নিয়ে অংশ নিয়েছেন। তবে এবারই প্রথম জাতীয় জাদুঘরে এত বড় আকারে এককভাবে জামদানির প্রদর্শনী করা হচ্ছে। জামদানি শাড়ি প্রস্তুতকারী ও কারিগরদের সহায়তা দিতে বিসিক ২০০১ সালে নারায়ণগঞ্জের তারাপুরে ২০ একর জায়গার ওপর জামদানি শিল্পনগর গড়ে তোলে। এখানে মোট প্লট আছে ৩৯৯টি। এর মধ্যে ২৯৮টি প্লটে জামদানির তাঁতিরা তাঁদের বয়ন কারখানা বসিয়ে উৎপাদন করে যাচ্ছেন। এই তাঁতিদের শাড়ি নিয়েই জাদুঘরে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।
প্রদর্শনীতে সর্বনিম্ন সাড়ে তিন হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকার জামদানি রয়েছে। বৈচিত্র্যময় নকশার জামদানি শাড়িতে পাড়ের নকশা ও শাড়ির ভেতরের নকশায় সাধারণত ভিন্নতা থাকে। শাড়ির পাড়ের নকশার মধ্যে আছে ময়ূরকণ্ঠী, পুঁইপাতা, করাতি, দুবলা, কবলা, গোলাপ, বেলপাতা, ইঞ্চি—এসব। ভেতরে থাকে জুঁই, বেলি, শাপলা, গোলাপ—এসব ফুল ও জ্যামিতিক নকশা। জামদানির দাম নির্ধারিত হয় প্রধানত এসব নকশার ওপর ভিত্তি করে। সুতার ব্যবহারের বিচারে দুই ধরনের জামদানি হয়। রেশমের টানা ও সুতির পোড়েনে বুননে তৈরি হয় হাফ সিল্ক জামদানি এবং সুতির টানা সুতির পোড়েনে সুতি জামদানি। ইদানীং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানায় রেশমের বদলে নাইলন সুতা ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব শাড়ির দামও বেশ কম। হাজার দেড়েকের মধ্যে মেলে। তবে এসব শাড়ি কিছুদিন পর কুঁচকে যায়।
প্রদর্শনীতে সোবহানবাগ থেকে শাড়ি কিনতে আসা একটি বেসরকারি ব্যাংকের চাকুরে আইনুন নাহার জানালেন, এখানে জামদানির দাম বাজারের অন্যান্য দোকানের চেয়ে খুব কম তা নয়, তবে বিসিকের ব্যবস্থাপনায় প্রদর্শনী হচ্ছে বলে রূপগঞ্জের আসল জামদানি এখানে মিলছে। তিনি পুঁইপাতা পাড় ভেতরে জুঁই ফুলের নকশা করা একটি হাফসিল্ক জামদানি কিনেছেন ছয় হাজার টাকায়। অন্য দোকানেও এ রকম শাড়ির দাম প্রায় কাছাকাছিই। তবে রূপগঞ্জের আসল জামদানি পাওয়ার নিশ্চয়তা আছে।
জামদানির বৈশিষ্ট্য, দরদাম, সমস্যা নিয়ে এখানে কথা হলো জামদানি শিল্পকল্যাণ মালিক সমিতির সভাপতি আবদুল বারেকের সঙ্গে। তিনি জানালেন, জামদানির কারিগরেরা পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যাচ্ছেন। এটাই প্রধান সমস্যা। কারিগরেরা যে মজুরি পান, তার চেয়ে অন্য পেশায় আয় বেশি বলে জামদানি বুনন ছেড়ে দিচ্ছেন। এখন রূপগঞ্জে বছরে এক লাখের মতো শাড়ি তৈরি হয়। এর মধ্যে একটি বড় অংশ ভারতে রপ্তানি হয়। আগে জামদানি রপ্তানিতে শতকরা ২৫ ভাগ প্রণোদনা দেওয়া হতো। এখন তা বন্ধ। এটি আবার চালু হলে জামদানিশিল্পের সংকট লাঘব হবে বলে তিনি জানালেন।
দেশের অন্য এলাকাতেও জামদানি তৈরি হচ্ছে। তবে আদি জামদানির বৈশিষ্ট্য হলো, এর নকশা শাড়ির উভয় পিঠেই একই রকম। অন্য এলাকায় জামদানির নকশায় উল্টো-সোজা আছে। অন্য এলাকায় জামদানি শাড়ি বুনন করা হয় নকশার ‘জ্যাকেট’ ব্যবহার করে। কাজেই রূপগঞ্জের আসল জামদানির অনুরাগীরা পছন্দের শাড়ির খোঁজে আসতে পারেন জাতীয় জাদুঘরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *